লকডাউনে মাথায় হাত বারুইপুরের ফল চাষীদের, বাগানে পচে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকার ফল

জেলা রাজ্য

বাগান ভরে লাল হয়ে আছে পাকা রসালো লিচু। সবুজ পাতার মাঝে দিয়ে উঁকি দিচ্ছে সাদা সাদা জামরুল। পেয়ারার ভারে নুয়ে পড়ছে কচি কচি গাছের ডাল। এত ফলন হওয়ায় সত্ত্বেও বিক্রির জায়গা নেই। আর ফল বিক্রি তেমন ভাবে না হওয়ার কারণে ক্ষতির মুখে পড়ছেন হাজার হাজার ফল চাষিরা। আদি গঙ্গার উর্বর পলিমাটির কারনে দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজপুর, বারুইপুর, কল্যাণপুর, ধপধপি ও কৃষ্ণমোহনপুর সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপকভাবে ফলের চাষ হয়। বাগানের পর বাগান এখন ভরে আছে লিচু, জামরুল ও পেয়ারা। এখন পেয়ারা সারা বছর পাওয়া গেলেও অন্য ফলগুলির মরশুম এটাই। খুব শীঘ্রই এই পাকা ফল গুলি বাজারজাত করতে না পারলে পেকে পড়ে নষ্ট হবে যাবে। বারুইপুর, কল্যাণপুর, ধপধপি এলাকাতে প্রচুর লিচু চাষ হয়। আছে সব পুরানো পুরানো বিরাট লিচু বাগান । মূলতঃ ‘বোম্বাই’ লিচু নামে যেটা পরিচিত সেটা বারুইপুর থেকে সরবরাহ করা হয় ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকাতে। পাড়ার মোড় থেকে শপিং মল, হাট বাজার থেকে শুরু করে বিভিন্ন এলাকায় এই লিচু বিক্রি হয় যথেষ্ট ভালো দামে। মে মাসের প্রথম থেকে শুরু করে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত এই লিচুর জোগান থাকে। কয়েক কোটি টাকার লিচু প্রতি বছর বিদেশে আমদানি হতো এই এলাকা থেকে। সৌদিআরব, দুবাই, কাতার এই সমস্ত জায়গাতেই লিচু পেয়ারা আমদানি হয় বারুইপুর থেকে। বিদেশে যেমন আমদানি করা হয় তেমন দেশের মধ্যেও যথেষ্ট চাহিদা আছে বারুইপুরের লিচু, পেয়ারা, জামরুল ও গোলাপ জামুনের। এর মধ্যে সবথেকে দামি ফল হলো গোলাপ জামুন। যা বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হয় ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকায়। বর্তমানে সে গোলাপ জামুন বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে। তাও খুব বেশি বিক্রি হচ্ছে এমন নয়। অর্ধেক ফল গাছে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে লিচুর পাকার পরে তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে না নামানোর কারণেই ছাল থেকে ফেটে যাচ্ছে। ফলে বেরিয়ে পড়ছে লিচু দানা ও শাঁস। কয়েকদিনের মধ্যেই এই লিচু বাজারজাত করতে না পারলে পুরোটাই এবার গাছে নষ্ট হয়ে যাবে। তেমনটা আশঙ্কা করছেন ফল চাষীরা। করিম গাজী নামে এক ফল চাষী বলেন, ফলের উপরেই আমাদের জীবন জীবিকা নির্বাহ হয়। প্রতিবছর লিচু বিক্রি করেই কয়েক হাজার টাকা ঘরে তুলি। আর সেই টাকা দিয়েই সারাবছরের খরচ চালাতে হয়। তার উপর আছে বাগান পরিচর্যা করার খরচ। কিন্তু বর্তমানে সেই লিচু গাছেই থেকে নষ্ট হতে বসেছে। চল্লিশ পঞ্চাশ টাকা করে পাইকারি দামে লিচুর প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে। তাও কেউ কিনতে চাইছে না। এখন যা অবস্থা লকডাউনের তাতে এবছর লিচু গাছেই পচে নষ্ট হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে। কল্যাণপুর এলাকায় বেশকিছু বাগানে গোলাপ জামুন চাষ করা হয়। মূলতঃ মুম্বাই, দিল্লি সহ ভারতের বিভিন্ন এলাকাতে এই গোলাপ জামুন যায় বারইপুর এলাকা থেকে। সুন্দর সুস্বাদু গন্ধযুক্ত এই ফলটি আপাতত এই এলাকায় যতটা পাওয়া যায় তার বেশিরভাগটাই রপ্তানি হয়ে যায়। এবছর আর সেই ফল রপ্তানি তো দূরের কথা পাড়ার মোড়ে বিক্রি হতে পারছে না। যথেষ্ট কম পয়সায় চাষিরা সেগুলো বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।কারণ বেশ কয়েকদিন থাকার পর পাকা ফল গাছ থেকে নিজের ইচ্ছায় ঝরে পড়ে যায়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাই বাজারজাত করতে না পারলে পুরো ফলটা পড়ে নষ্ট হয়ে যাবে। এ বিষয়ে বারুইপুরের ফল চাষী সুজন নস্কর বলেন, “গোলাপ জামুন এর চাহিদা সারা ভারতবর্ষে আছে। শুধু ভারতবর্ষে নয় বাইরের দেশেও এই গোলাপ জামুন বিক্রি করা হয়। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে এই ফল পাকতে শুরু করে। মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে লকডাউনের যা পরিস্থিতি পাড়ার কিছু কিছু দোকানদার কিনে নিয়ে বিক্রি করছেন তবে তা খুব সামান্যই।” বারুইপুরের পেয়ারা খ্যাতি সারা পৃথিবী জুড়ে। আজ এখানকার পেয়ারা যেহেতু বেশিরভাগটাই রপ্তানি নির্ভর তাই শুধু মরশুমে নয় সারা বছরই এখন পেয়ারা পাওয়া যায়। পেয়ারা গাছে বিভিন্ন ঔষধ প্রয়োগ করে এই পেয়ারার যোগান ঠিক রাখা হয়। বর্তমানে বাগানে পেয়ারা গুলি পেকে পচে যাচ্ছে। ফলে এই পেয়ারা গুলি আর রপ্তানি করা সম্ভব নয়। যা সমস্যার কারণ শুরু হয়েছে। আর্থিক ক্ষতির দিক থেকে যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এই এলাকার চাষিরা। শুধু তাই নয় এলাকায় কোন হিমঘর না থাকার কারণে সেই ফল তৎক্ষণাৎ বাজারজাতও না করতে পারলে পুরোটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শুধু হিমঘরের সমস্যা যেমন ফল দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তেমনি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এর ব্যবস্থা না থাকার কারণে সেইসব ফলগুলো পাকার পরে দেখা যাচ্ছে সমস্যা। ফলে লিচু, পেয়ারা, জামরুল গোলাপ জামুন থেকে কয়েক কোটি টাকার লোকসান হবে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *